1. nafiz.hridoy285@gmail.com : Hridoy Fx : Hridoy Fx
  2. miahraju135@gmail.com : MD Raju : MD Raju
  3. koranginews24@gmail.com : সম্পাদক : সম্পাদক
আবু সালেহ স্যার: শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ ছিল না মসৃণ - করাঙ্গীনিউজ
করাঙ্গী নিউজ
স্বাগতম করাঙ্গী নিউজ নিউজপোর্টালে। ১৩ বছর ধরে সফলতার সাথে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে আসছে করাঙ্গী নিউজ। দেশ বিদেশের সব খবর পেতে সাথে থাকুন আমাদের। বিজ্ঞাপন দেয়ার জন‌্য যোগাযোগ করুন ০১৮৫৫৫০৭২৩৪ নাম্বারে।

আবু সালেহ স্যার: শিক্ষকতার দীর্ঘ পথ ছিল না মসৃণ

  • সংবাদ প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৪ মে, ২০২২

ফয়সল আহমদ রুহেল : প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে থেকেছেন অন্যের বাড়িতে লজিং। বর্ষায় মাদ্রাসায় আসা যাওয়ার একমাত্র পথ ছিল নৌকা। মাদ্রাসায় যাতায়াত করেন নৌকায়। শত কষ্টের মাঝেও লেখাপড়া চালিয়ে যান। কওমী মাদ্রাসার হুজুরের নিকট প্রাইভেট পড়তেন। বর্ষায় সেই হুজুরের সাথে দিনে নৌকা দিয়ে মাদ্রাসার কালেকশনে বের হতেন। কালেকশন করতে গিয়ে সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছাতেন। কর্মজীবনে বর্ষায় বাড়ি হতে নৌকায়, হেমন্তে পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে। এভাবে মোঃ আবু সালেহ শাহ দীর্ঘ প্রায় ৩৪ বছর শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো বিলিয়ে দেন। তিনি হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা কে.জি.পি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক।

 

জন্ম : শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মোঃ আবু সালেহ শাহ ১৯৬১ সালের ১লা মার্চ হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশা ইউনিয়নের পশ্চিম ভাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোঃ মফিজুল হোসেন শাহ, মাতা মোছাঃ খোদেজা খাতুন। মোঃ আবু সালেহ শাহ ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ।

 

শিক্ষা জীবন: মোঃ আবু সালেহ শাহ প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি শুরু ১৯৬৬ সালে পশ্চিমভাগ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি ১৯৭০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ১৯৭১ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা বানিয়াচং সিনিয়র ফাজিল (আলিয়া) মাদ্রাসায় শুরু হয়। এস.এস.সি সমমান দাখিল ১৯৭৫ সালে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ঢাকার অধীনে ৩য় বিভাগে পাশ করেন। ১৯৭৭ সালে এইচ.এস.সি সমমান আলিম একই বোর্ডের অধীনে বানিয়াচং সিনিয়র ফাজিল (আলিয়া) মাদ্রাসা থেকে ৩য় বিভাগে পাশ করেন। ১৯৭৯ সালে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ঢাকার অধীনে বানিয়াচং সিনিয়র ফাজিল (আলিয়া) মাদ্রাসা থেকে স্নাতক সমমান ফাজিল ৩য় বিভাগে পাশ করেন। ১৯৯৬ সালে কুমিল্লা জেলার সোনাকান্দা বহুমুখী আলিয়া মাদ্রাসা হতে স্নাতকোত্তর সমমান কামিল প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ২য় শ্রেণীতে পাশ করেন।

কর্মজীবন :
শ্রদ্ধেয় মোঃ আবু সালেহ শাহ জলসুখা কে.জি.পি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৮৭ সালের ১লা জুলাই ধর্মীয় শিক্ষক পদে যোগদান করেন। এরপর ২০০৭ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব এবং ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক পদ হতে অব্যাহতি নেন। ধর্মীয় শিক্ষক পদে সিলেট এবং হবিগঞ্জে অনেক ট্রেনিং নেন। সর্বশেষ ৩৩ বছর ৮ মাস শিক্ষকতার পর ২০২১ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মাসে উক্ত জলসুখা কে.জি.পি উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই অবসরে যান।

ট্রেনিং : শিক্ষকতা জীবনে তিনি সিলেট টি.টি কলেজে সি.পি.ডি ট্রেনিং ১৪ দিন। ট্রেনিং শেষের দিন স্যার বললেন তাদেরকে পরের দিন জাফলং ভ্রমনে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেদিন প্রচণ্ড গরম থাকায় আর সেখানে যাওয়া হয়নি।তাই তাদের স্যার তাদেরকে নিয়ে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। তাদেরকে অনেক কিছু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দেখান।

শিক্ষা জীবনের স্মরণীয় ঘটনা

মোঃ আবু সালেহ শাহ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে বানিয়াচং সিনিয়র ফাজিল (আলিয়া) মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সে সময় তাঁর লজিং হয় বানিয়াচং এর উত্তরদিকে মজলিশপুর মহল্লায়। বর্ষার সময়ে মাদ্রাসায় আসা যাওয়ার একমাত্র পথ ছিল নৌকা। সেই মহল্লার মধ্যে মাদ্রাসার ছাত্র ছিল বেশি। এ কারনে দুইটি নৌকা দ্বারা ছাত্ররা মাদ্রাসায় আসা-যাওয়া করতেন। মাদ্রাসা ছুটির পর লজিং এ যাওয়ার সময় প্রায়ই উক্ত দুই নৌকায় কে আগে যেতে পারে রীতিমতো প্রতিযোগিতা হতো। মাঝে মধ্যে নৌকা ডুবানো হতো। যে দিন নৌকা ডুবানো হবে সেই দিন বইপুস্তক পূর্বের সংকেত অনুযায়ী ছাত্ররা কম নিতেন। ছাত্ররা যে নৌকায় যেতেন সেই নৌকায় মাদ্রাসারই একজন হুজুর যেতেন। তিনি ছিলেন খুবই সরল মনের। ছাত্রদের সঙ্গে তিনি ধর্মীয় উপদেশমূলক অনেক আলাপ-আলোচনা করে তাদের মন মুগ্ধ করে দিতেন। হুজুর ইহজগতে নাই। কিন্তু হুজুরের স্মৃতি আজও তাঁর ছাত্রদের সামনে ভেসে উঠে।

 

হেমন্ত সময়ের আরেক ঘটনা:

মোঃ আবু সালেহ শাহ যে বাড়িতে লজিং থাকতেন। সেই বাড়ির দুইজন ছাত্র ছিল, একজন পড়তো মাদ্রাসায় অন্যজন এল.আর হাই স্কুলে। একদিন ঘটনা চক্রে মোঃ আবু সালেহ মাদ্রাসায় যাওয়া তাদের সঙ্গে পড়লো। তারা বানিয়াচং বড় বাজারের একজন দর্জির নিকট বসে গল্প করতে শুরু করলো। আবু সালেহ তাদেরকে বললেন চল মাদ্রাসায় যাই। কিন্তু তারা বলে যাই-যাচ্ছি। এভাবে মাদ্রাসার সময় কাটিয়ে দিত তারা। পরে তারা দর্জির নিকট হতে বের হয়ে এখানে-সেখানে যেত। গল্প গোজব করে সময় পার করতো। যখন মাদ্রাসা ছুটি হলো তখন তারা বইপুস্তক নিয়ে বাড়িতে চলে যেত। কিন্তু আবু সালেহ এর দিনটি যেন জেলখানা অনুভব হল। সেই দিন হতে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন ‘আল্লাহ যেন কোনদিন তোমাদের সঙ্গে আমাকে মাদ্রাসায় আর না নেন।’ এরপর হতে আর কোন দিন আবু সালেহ তাদের সাথে মাদ্রাসায় যাননি। যেই বৎসর আবু সালেহ মাদ্রাসায় ভর্তি হন সেই বৎসর স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ছাত্রদের মিছিল শুরু হলো। প্রায়ই এল.আর হাই স্কুলের ছাত্ররা মিছিল নিয়ে মাদ্রাসার নিকট এসে যখন শ্লোগান দিতো তখন মাদ্রাসার ছাত্ররা সেই মিছিলে যোগ দিতো। তখন ছাত্ররা মাদ্রাসার পূর্বদিকের রাস্তা দিয়ে থানার নিকট দিয়ে সি.ও অফিস পার হয়ে বড়বাজার প্রদক্ষিণ করে আবার আলোচনা সভা শুরু করতেন। সেই মিছিল দেওয়াটা খুবই আনন্দের ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রাম সমন্ধে তেমন কোন ধারনা ছিল না তাদের।
ছাত্ররা মিছিল নিয়ে যখন সি.ও অফিসে (বর্তমানে উপজেলা অফিস) যায় তখন নেতা দেখেন সি.ও অফিসে সবুজ নিশান উঁড়ানো। কিন্তু সেই সময়ে কালো নিশান উঁড়ানো হতো। এটা দেখে ছাত্ররা ইটের টুকরা দ্বারা ঢিল ছুঁড়তে লাগলো এবং ভাংচুর শুরু করলো। এমন সময় সি.ও একজন ছাত্রের উপর গুলি ছুঁড়লে এক ছাত্র আহত হয়। তখন ছাত্রগণ পাগলের ন্যায় আরও ভাংচুর এবং সি.ও কে খোঁজ করতে শুরু করলো। কিন্তু সি.ও কে পায়নি। সেই দিনের দৃশ্যটি খুবই ভয়াবহ ছিল। এর দু’একদিন পর ছাত্ররা দেখতে পায় সেনা বাহিনীর ৮/৯টি গাড়ী এসেছে। তখন সেই সেনারা ছাত্র এবং পাকিস্তান বিরোধী লোকদেরকে ধরতে থাকে। ছাত্ররা তখন যে যেখানে পারে সেখানে চলে যায়। আবু সালেহ তখন বাড়িতে চলে আসেন। লেখাপড়া ছাড়া ভাল লাগে না, তাই আবু সালেহ পার্শ্ববর্তী গ্রাম শিবপাশায় একটি কওমী মাদ্রাসার হুজুরের নিকট প্রাইভেট পড়াশুনা শুরু করেন। বর্তমানে হুজুর ইহজগতে নেই।
বর্ষায় হুজুর নৌকা দ্বারা মাদ্রাসার কালেকশনে বের হতেন। সঙ্গে আবু সালেহ সহ অন্য কয়েকজন ছাত্রকে সঙ্গে নিলেন। হুজুর রাত্রের বেলায় ওয়াজ করতেন আর দিনের বেলায় ছাত্ররা তার নিকট পড়তেন। কালেকশন করতে করতে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই গিয়ে পৌঁছাতেন। তখন দিরাইর হাসপাতালে আবু সালেহসহ ছাত্ররা বেড়াতে যান। হাসপাতালে গিয়ে দেখেন দালানের মধ্যে অনেকগুলি ছিদ্র। মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করলে এই ছিদ্রগুলি কিসের? তারা বলেন এখানে মুক্তিবাহিনী ও পাক বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছিল। তারপর সেই হুজুরের নিকট হতে বিদায় নিয়ে আবু সালেহ আবার বানিয়াচং সিনিয়র ফাজিল (আলিয়া) মাদ্রাসায় যোগদান করেন।

শিক্ষকতা জীবনের দু’একটি স্মরণীয় ঘটনা

শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মোঃ আবু সালেহ শাহ ১৯৮৭ সালের ১লা জুলাই জলসুখা কে.জি.পি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সে সময়ে বর্ষায় বাড়ি হতে নৌকা দ্বারা এবং হেমন্তকালে পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতেন। বর্ষায় দিনের অবস্থায় খারাপ থাকলে যাতায়াত খুবই কষ্টকর হতো। মোঃ আবু সালেহ শাহ ও বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বাবু শচীন্দ্র দেব রায় তারা দুইজন একটি কোশা নৌকা দ্বারা স্কুলে যেতেন। বর্তমানে এই শিক্ষক ইহজগতে নেই।
একদিনের ঘটনা : স্কুল ছুটির পর আবু সালেহ সহ কয়েকজন বাড়িতে রওনা দিলেন। গ্রামের বাহিরে এসে দেখতে পান প্রবল বাতাসে খুবই বড় বড় ঢেউ উঠছে, মাঝির সাহস হয় না নৌকা ছাড়তে। তারা গ্রামের ভেতর প্রবেশ করেন, মনের মধ্যে তাদের ধারনা বাতাস নিরব হলে নৌকা ছাড়বে। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো কিন্তু বাতাস কমেনি। তাদেরকে দেখে একজন মেম্বার সাহেব তাঁর বাড়িতে নিলেন এবং তিনি যথেষ্ট যত্ন করলেন। পরদিন সেখান থেকেই বিদ্যালয়ে তারা চলে যান। সেই সময় মোবাইল ফোন ছিল না কোন সংবাদ বাড়িতে দিতে পারেননি। এদিকে, বাড়ির লোকেরা খুবই চিন্তায় ছিলেন। তারা বাড়িতে আসার পর তাদের চিন্তা দূর হয়।

পশ্চিম ভাগ হতে জলসুখার দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। তাই পশ্চিম ভাগ হতে যাতায়াত করা খুবই কষ্টকর। কারণ কোন ভাল রাস্তা ছিল না। আমন জমির উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হতো। এভাবে আবু সালেহ হেঁটে প্রায় ৮ বৎসর বিদ্যালয়ে যান। ফজরের নামাজ পড়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেন। হেঁটে গেলে প্রায় ২ ঘন্টার বেশি সময় লাগে। প্রতিদিন হাঁটতে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়তো। লজিং তেমন মিলতো না। শচীন্দ্র বাবুর সঙ্গে প্রায় ৬/৭ বৎসর এক সঙ্গে বিদ্যালয়ে তিনি যান। তারপর তিনি পরলোকগমন করেন। তখন আবু সালেহ একা একা বিদ্যালয়ে গিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় একা পথ চলার সময় সেই স্যারের কথা স্মরণ হয়ে যেত আবু সালেহ স্যারের। কত গল্প করে যাতায়াত করতেন। এই গল্পের মধ্যে শারীরিক পরিশ্রম টের পাননি আবু সালেহ।

একদিন বিদ্যালয় ছুটির পর আবু সালেহ একা একা বাড়িতে রওনা দেন। জলসুখা গ্রাম পাড় হয়ে দেখতে পান আকাশে কিছু সাজ করছে। যত পথ চলতেছেন দেখতে পান সাজটি ঘনিয়ে আসছে।

তিনি কাজাউড়া হাওরে আসার পর এমনি সময়ে দেখতে পান সাজটি লাল বর্ণ ধারণ করছে। আবু সালেহ খুবই তরিৎ গতিতে হাঁটা শুরু করলেন।কাজাউড়া হাওরের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ অতিক্রম করেছেন। এমনি সময়ে দেখতে পান আবু সালেহ এর নিকট হতে প্রায় ১০/১৫ হাত দূরে বড় বড় কয়েকটি শিলা পাথর পড়ছে এবং বাতাসও বইছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছাতা টাঙ্গান। নিকটে ছিল একটি পুকুর, তাড়াহুড়া করে বাতাসের বিপরীত দিকে ছাতা ধরে পুকুরের পাড়ের কিনারায় বসলেন। প্রবল বাতাস বইতেছে ও বড় বড় শিলা পাথর বর্ষণ হচ্ছে। একটি পাথরের ওজন প্রায় ২০০ হতে ২৫০ গ্রাম হবে। ছাতার মধ্যে পাথর গুলি পড়ে এবং স্লিপ কেটে মাটিতে পড়তেছে। তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা ও দোয়া পড়তে লাগলেন। মনে মনে ভাবলেন আজ আর বাঁচবেন না। দীর্ঘ সময় প্রায় ৪০/৪৫ মিনিট পর শিলা পাথর বর্ষণ শান্ত হয়। তারপর বাড়ির দিকে রওনা হন। আবু সালেহকে রাস্তায় পেয়ে সকলেই জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন ঝড়ের সময় আপনি কোথায় ছিলেন। আবু সালেহ এর বড় ছেলে তাঁকে খোঁজে সে রাস্তায় বের হয়ে প্রায় অর্ধকিলোমিটার দূরে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। বাড়িতে এসে দেখতে পান বসত ঘরের চালের উপর একটি বড় পাথর পড়ছিল, অনেক শক্ত টিনকে লোহা হতে পৃথক করে চাপা দিয়েছে। সেদিন আবু সালেহ এর বাঁচার কোন আশা ছিল না। এছাড়া দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াতকালে আরও অনেক ঝড় তুফানের কবলে পড়েন। একমাত্র আল্লাহই তাঁকে বাঁচিয়েছেন।

অন্য আর একদিনের ঘটনা : বিদ্যালয় হতে আসার পথে নৈঋত কোণে সাজ করেছে। আবু সালেহ জলসুখা গ্রাম হতে প্রায় ১ মাইল দূরে এসেছেন। হঠাৎ ঝড় তুফান শুরু হলো। তার সাথে বিদ্যুৎ চমকে বজ্রপাত শুরু হলো। আবু সালেহ ছাতা নিয়ে বসে রইলেন এবং দোয়া কালাম পড়তে লাগলেন। দীর্ঘ সময় সেই ঝড় তুফান হতে লাগল। তাঁর আশপাশে প্রায় ২৫ হতে ৩০টি বজ্রপাত হচ্ছিল। যেমন ধরনের বিবাহের বাড়িতে আতশবাজী হয় সেইভাবে বজ্রপাতের শব্দ হচ্ছিল। একমাত্র আল্লাহ সহায় থাকায় বিভিন্ন বিপদাপদ হতে তিনি রক্ষা পান। ৮ বৎসর পর জলসুখার পশ্চিম দিক দিয়ে একটি কাঁচা রাস্তা হয়। সেই রাস্তা দিয়ে গ্রামবাসী হাওর হতে ধান কেটে নিয়ে যেতেন। তখন আবু সালেহ সেই রাস্তা দিয়ে বাইসাইকেলে যাতায়াত করতেন। তবে প্রায়ই পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতেন। কারণ বৃষ্টি দিনে সাইকেল দ্বারা যাতায়াত করা সম্ভব হতো না।

বর্ণাঢ্য জীবন : মোঃ আবু সালেহ শাহ জলসুখা কে.জি.পি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার নিয়োগ হওয়ার পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা থানার সিমের কান্দা এবং ইছাকপুর গ্রামে প্রায় চার বছর মসজিদে ইমাম হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন। সেখানের লোকেরা তাকে খুবই শ্রদ্ধা এবং ভালবাসতো। এখনও ওখানকার লোকজন আজমিরীগঞ্জ বাজারে তাকে পেলে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি কামিল পরীক্ষা পাশ করার পর পশ্চিম ভাগ শাহী ঈদগাহে,গ্রামবাসী তাকে ইমাম হিসাবে নিযুক্ত করেন। উক্ত ঈদগাহে প্রায় ১৮ বছর যাবত ইমাম হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন।

পারিবারিক জীবন : মোঃ আবু সালেহ শাহ ৫ ছেলে ও ১ কন্যা সন্তানের জনক। তাদের মধ্যে শাহ মোশারফ হোসেন- ৯ম শ্রেণী পাশ করার পর তার শারীরিক অসুবিধার কারণে আর পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। শাহ মোকাররম হোসেন-তিনি ইংরেজী বিভাগে অনার্স,মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। শাহ মোফাজ্জল হোসেন-বিএ সম্পন্ন করে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত। মেয়ে মোছাঃ শিরীন আক্তার, তিনি বিএ ১ম বর্ষে অধ্যায়নরত। শাহ মোঃ মওদুদ আহমেদ-ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রমের,কম্পিউটার সায়েন্স এবং টেকনোলজি ডিপার্টমেন্টে ৭ম সেমিস্টারে অধ্যায়নরত। শাহ মোঃ ময়নুল হোসেন তায়েফ, বিজ্ঞান বিভাগে এস.এস.সি পরীক্ষার্থী (২০২২)।
মোঃ আবু সালেহ শাহ পড়ালেখার জীবন শেষ করে যুক্ত হন শিক্ষকতা পেশায়। শিক্ষকতা পেশা তার কাছে মহান। অনেক ছাত্রের জীবন গড়ার কারিগর তিনি। ছাত্ররাও তার কাছে চির ঋণী।

গুনী এই শিক্ষক ২০২২ সালে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে কাজ করা হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার কৃতি সন্তান জনাব টি. আলী স্যারের নামে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাজ্য ভিত্তিক চ্যারেটি সংস্থা টি.আলী স্যার ফাউন্ডেশনের জরিপে আজমিরীগঞ্জ উপজেলার আদর্শ শিক্ষকের সম্মাননার স্বীকৃতি হিসেবে টি. আলী স্যার ফাউন্ডেশন সন্মাননা পদকে
ভুষিত হয়েছেন।
উল্লেখ্য, ফাউন্ডেশন হবিগঞ্জ জেলার নয় উপজেলার ১৮ জন আদর্শ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে পদক দেয়ার পাশাপাশি তাদের জীবনী ধারাবাহিকভাবে লিখছেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি টি. আলী স্যারের পুত্র বৃটেনের জনপ্রিয় চ্যানেল এস টেলিভিশনের সাংবাদিক ফয়সল আহমদ (রুহেল)। পদকপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে থেকে আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ৫ জন শিক্ষককে আর্থিক সহযোগিতাও দেবে সংস্থাটি।

মোঃ আবু সালেহ শাহ এর শিক্ষকতার এই দীর্ঘ পথ খুব বেশি মসৃণ ছিল না। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাকে এই পেশায় টিকে থাকতে হয়েছে। স্কুলে যোগদানের পর বর্ষাকালে প্রচুর কাদা মাটি অতিক্রম করে ক্লাস করাতে যেতে হতো। ফজরের নামাজ পড়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেন। শুকনো মৌসুমে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসতেন তিনি। স্কুল থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। মোঃ আবু সালেহ শাহ অসংখ্য শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নিজ সন্তানদেরকে আলোকিত মানুষ করেছেন। আবু সালেহ এর মতো মানুষেরা আছেন বলেই আজও আমরা স্বপ্ন দেখে যাই; সুখী, সুন্দর, শিক্ষার আলোয় আলোকিত এক বাংলাদেশ। এই শিক্ষকের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ূ কামনা করি।

লেখক-

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো সংবাদ