1. nafiz.hridoy285@gmail.com : Hridoy Fx : Hridoy Fx
  2. miahraju135@gmail.com : MD Raju : MD Raju
  3. koranginews24@gmail.com : সম্পাদক : সম্পাদক
যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট - করাঙ্গীনিউজ
  • Youtube
  • English Version
  • রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন

করাঙ্গী নিউজ
স্বাগতম করাঙ্গী নিউজ নিউজপোর্টালে। ১২ বছর ধরে সফলতার সাথে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে আসছে করাঙ্গী নিউজ। দেশ বিদেশের সব খবর পেতে সাথে থাকুন আমাদের। বিজ্ঞাপন দেয়ার জন‌্য যোগাযোগ করুন ০১৮৫৫৫০৭২৩৪ নাম্বারে।

যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট

  • সংবাদ প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৭ অক্টোবর, ২০২১

করাঙ্গীনিউজ: পড়ন্ত বিকাল। সামারের শেষদিক। সেপ্টেম্বরের এ শেষের সময়টায় ঠাণ্ডা শুরু হওয়ার কথা। সাধারণত সেপ্টেম্বরের প্রথম থেকেই ঠাণ্ডা শুরু হয়ে যায়। গ্রিনহাউস এফেক্টের কারণে সামার প্রলম্বিত এবং শীত আগমনে বিলম্ব হচ্ছে। সামারের গরমটুকু শেষ হওয়ার পথে।

টেমস নদীর ওপর দিয়ে সূর্যিমামা দিন শেষে বিদায় নেওয়ার আগে তার শেষ আভাটুকু চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজের উপর দিয়ে হেঁটে আসার সময় ইমদাদ এবং নিতুর এই দৃশ্য দেখতে অপূর্ব লাগছিল। অনেক দিন পর আজ ইমদাদ এবং নিতু ঘুরতে বেরিয়েছে। শুধুমাত্র ওরা দুজন। বাসায় বাচ্চাগুলো রেখে এসেছে। বাচ্চারা স্কুল থেকে এসে নাস্তা করে যার যার মতো হোমওয়ার্ক করছে।

ওরা দুজন আজ লন্ডনের টেমস নদীর তীরে টাওয়ার ব্রিজের পশ্চিমে পাশে যেখানে সিটি হল সেখানকার সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে আছে। হাতের বাম দিকে লন্ডন ব্রিজ এবং ডান দিকে টাওয়ার ব্রিজ। লন্ডনের আইকন হচ্ছে এই টাওয়ার ব্রিজ। পশ্চিমে লন্ডন ব্রিজ এর আগে নোঙর করা একটি যুদ্ধজাহাজ তাদের দৃষ্টিকে আটকে দিচ্ছে। এ জাহাজের নাম হচ্ছে এইচএমএস বেলফাস্ট।

এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত একটি যুদ্ধজাহাজ; যা বর্তমানে মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ওদের থেকে একটু দূরে আইসক্রিমের গাড়ির সামনে কিছু বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন রঙের বাচ্চা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটাই লন্ডনের বৈচিত্র্য। কালচারাল ডাইভারসিটি।

ঢাকায় যেমন বাংলাদেশের সব জেলার লোক পাওয়া যায় ঠিক তেমনি লন্ডনে পৃথিবীর সব দেশের, সব ভাষার লোকদের পাওয়া যায়। সবাই মিলে মিশে বসবাস করছে, কাজ করছে। নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করছে। ওদের পেছনে বিশ-বাইশ বছরের দুজন কপোত-কপোতি খুব ঘনিষ্ঠভাবে বসে ভালোবাসার কথা প্রকাশ করছে।

ওদের ঠিক সামনেই আশি ঊর্ধ্ব দুজন ব্রিটিশ নর-নারী খুব মজা করে আইসক্রিম খাচ্ছে। এই বয়সে ওদের ভালোবাসা দেখে ওদের নিজেদের লজ্জা লাগছে। সারাক্ষণ দুজনে হাত ধরে বসে আছে এবং একজন আরেকজনকে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছে। ওরাও একটু আগে দুটো আইসক্রিম কিনে খেতে খেতে নিজেদের ফেলে আসা দিনগুলো নিয়ে কথা বলছিল।

এই তুমি এতো কী ভাবছো আজ? হঠাৎই নিতুর প্রশ্নে ইমদাদের ভাবনায় ছেদ পরে। না, কিছু না তো! ভাবছিলাম কোথা থেকে কোথায় আসলাম আজ।

মাঝে মাঝে তোমার কথার মাথা-মুণ্ডু বুঝি না। অন্য সময় মুখ ঝামটা দিলেও আজ তার পুনরাবৃত্তি করলো না নিতু। কেন জানি মনে হচ্ছে শেষ বিকেলের এই পরিবেশে মুখ ঝামটা দেওয়াটা অন্যায় হবে। কেন জানি আজ ইমদাদকে একটু বেশিই ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে তার। সামনের বুড়ো-বুড়ির দেখাদেখি ও আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে ইমদাদ।

তোমার কি মনে আছে যখন আমি প্রথম লন্ডনে আসি সেদিনকার কথা। ইমদাদ শুরু করে।

আমি জানবো কী করে? আমি তো তখন তোমাকে চিনতাম না। নিতু উত্তর দেয়।

না, সেই কথা বলছি না। তোমাকে তো বলেছিলাম লন্ডনে আসার পরে আমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথা। সংগ্রামের কথা। আজ শুনবে কি আবার সেই পুরনো দিনের কথাগুলো!

বলো না আবার প্লিজ। যতবার শুনি ততবারই ভালো লাগে। কতই না কষ্ট করেছো তুমি! আমাদের দুজনের আজকের এই একান্ত সময়টুকু পাওয়ার জন্য আমাদের কতই না কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে। কাজ-ঘর-বাচ্চা এই ছিল আমাদের জীবনের ধরাবাঁধা রুটিন। হাঁপিয়ে উঠছিলাম। আজ আবার শুনবো নতুন করে। বলো তুমি। নিতু ইমদাদের ঘাড়ে হেলান দিয়ে বসে।

২০০১ সালের কথা। আশপাশের বন্ধু-বান্ধব যার যার মতো প্রতিষ্ঠিত হলেও নিজে যেন দাঁড়াতে পারছিলাম না। তিতুমীর কলেজের থেকে পড়া শেষ করে মিল্টন ওয়ার্ল্ড ভিশনে, মনির বিএটিসির ডিস্ট্রিবিউশনে, হেদায়েত এক কোম্পানিতে এবং মিজানও কোনো এক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিল। রফিক নামের এক বন্ধুকে সরকারি দফতরে চাকরির জন্য টাকা দিয়ে ধরা খেয়েছি। এখানে বন্ধু রফিকের কোনো দোষ ছিল না। সে তো আমার জন্যই চেষ্টা করছিল। বন্ধু এরশাদ তখন বিএটিসিতে কাজ করত।

এরশাদের সহযোগিতায় পাবনায় গিয়ে তার এরিয়ার এক ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারে কাজও পেয়েছিলাম আমি ও বন্ধু মনির। কিন্তু বাসা থেকে পারমিশন মিলল না পাবনায় থেকে কাজ করার জন্য। ড্যাফোডিলে কম্পিউটার ডিপ্লোমায় ভর্তি হলাম। পাশাপাশি নিজের চেষ্টায় আরেক বন্ধু ইমুর সাথে হস্ত শিল্পের ব্যবসা শুরু করলাম। প্রাইভেটে মাস্টার্স করলাম। আইসিএমএ তে যেতাম মাঝে মাঝে।

সব কিছু নিয়ে যেন কেমন তাল-গোল পাকিয়ে ফেলছিলাম। সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছিলাম না। মানুষ বাবা-মার টাকা- পয়সা নষ্ট করে নেশা-পানি- আড্ডায়। আর আমি নষ্ট করেছি পড়া-লেখা-কাজ-ব্যবসা ইত্যাদির নামে। আমার কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাপ্পী আন্তরিকভাবে চাচ্ছিল আমি যেন আমেরিকায় তার কাছে চলে যাই। কিন্ত আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। দুইবার চেষ্টা করার পরেও আমেরিকার ভিসা পাইনি।

এমন সময়ই আল্লাহর ইচ্ছায় লন্ডনে আসার একটি সুযোগ পেয়ে যাই। আব্বার কাছে অনুরোধ করি আমাকে যেন সে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়। আব্বার ব্যবসার অবস্হা তখন ভালো ছিল না। সে তার এক কলিগের কাছ থেকে টাকা ধার করে আমাকে এক সেমিস্টারের টিউশন ফি দেয়। আমিও লন্ডনে এসে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।

লন্ডনে এসে উঠি টংগির বন্ধু জামিলের আরেক বন্ধু আলমগীরের ওখানে। ইচ্ছে করেই ডেফোডিলের ছোট ভাই তারেকের ওখানে উঠিনি যার সাথে একসাথে কম্পিউটার ডিপ্লোমা করেছি। আলমগীর মাঝে মাঝে আমাদের টঙ্গীর বাসায় আসতো। তখন থেকেই ঘনিষ্ঠতা। আলমগীর তখন ক্লাপহাম কমনের মহারানী রেস্টুরেন্টে কাজ করতো। কাজে থাকায় আমাকে হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভও করেনি।

আমার সংগ্রামের শুরু সেদিন থেকেই। দুটি বড় বড় লাগেজ টেনে-হেঁচড়ে অপরিচিত লন্ডন শহরের অপরিচিত আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে চড়ে বন্ধুর রেস্টুরেন্টে চলে আসি। আসার পথে ট্রেন পরিবর্তন করার সময় প্রতিবারই বন্ধু আলমগীরকে কল করে ডিরেকশন নিয়েছিলাম। বন্ধুকে দেখে যেন আমার ঘাম ছেড়ে জ্বর ছাড়ে।

দুই রাত আলমগীরের রেস্টুরেন্টে কাটিয়ে তৃতীয় দিনের মাথায় লন্ডনের বাঙালিপাড়া ব্রিকলেনের এক বাঙালি জব সেন্টার থেকে বিশ পাউন্ডের বিনিময়ে রেস্টুরেন্টের ওয়েটারের কাজ পাই ব্রমলি সাউথ নামক জায়গায় যা লন্ডন ব্রিজ স্টেশন থেকে ট্রেনে বিশ মিনিটের দূরত্বে।

কি ঘুমিয়ে পড়লে নাকি! নিতুকে জিজ্ঞেস করে ইমদাদ। একটু লম্বা হয়ে যাচ্ছে না!

না না। আমি শুনছি তোমার জীবন যুদ্ধের কথা। আমরা সবাই যোদ্ধা। আমরা প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছি। তুমি বলে যাও, থেমো না।

লন্ডনের ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট গুলোর নব্বই ভাগই বাংলাদেশি মালিকানাধীন কিন্ত নামে ইন্ডিয়ান। ইংরেজরা ভারত শোষণ করার সময় থেকেই ভারতীয় ফুডের সাথে পরিচিত। তাই এখানকার বাংলাদেশিরা ব্যবসা হারানোর ভয়ে তাদের রেস্টুরেন্টগুলো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট নামেই পরিচিত করিয়েছে। ইংল্যান্ডের বাংলাদেশিদের আবার নব্বই ভাগই সিলেট অঞ্চলের।

রেস্টুরেন্টে কাজে যোগ দিয়েই পরের দিন কলেজে ভর্তি হয়ে এক দিন ক্লাস করে ড্রপ দিয়ে দিই। থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্হা রেস্টুরেন্টের ভিতর। লন্ডন থেকে একটু দূরে হওয়ায় স্টাফরা কাজ শেষে রেস্টুরেন্টের উপরের ঘরে থেকে যেতো এবং শুধুমাত্র উইক এন্ডে ঘরে যেতো পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য। আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। তাই রেস্টুরেন্টের উপরের ঘরেই থাকতাম। রেস্টুরেন্টের সিলেটি স্টাফ গুলো আমাকে প্রথম প্রথম মেনে নিতে পারছিল না।

ওদের ভাষায় আমি ছিলাম ঢাকাইয়া, শিক্ষিত। এত শিক্ষিত হয়েও আমি কেন রেস্টুরেন্টে কাজ করব? টাকার জন্য? বাংলাদেশের সিলেট বাদে বাকি সব অঞ্চলের লোকদের সিলেটিরা ঢাকাইয়া বলতো। আমি কোনোরকমে মুখ বুঁজে ওদের টিকা-টিপ্পনি সহ্য করে কাজ করে যাচ্ছিলাম।

আমার তো যাওয়ার আর কোনো জায়গা ছিল না। নতুন এসেছি লন্ডনে। ভালো ইংরেজিও বলতে পারি না যে অন্য কোথাও কাজ নিব। কাজ নিলেও বাসা ভাড়া ও খাওয়া-দাওয়ার পর হাতে কিছু সেভিংস থাকবে না। দেশে কীভাবে টাকা পাঠাব? এসব চিন্তায় সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে যেতাম।

একদিন বন্ধু তানিম যে নটরডেম কলেজে পড়তো এবং একসাথে প্রাইভেট পড়েছি, আমার সাথে দেখা করতে রেস্টুরেন্টে আসে সেই সুদূর অক্সফোর্ড থেকে। সে অক্সফোর্ডে তার মামার রেস্টুরেন্টে কাজ করতো। খুবই চাপা স্বভাবের এবং মেধাবী ছাত্র ছিল সে। হঠাৎ কি হলো তার কে জানে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সে রাশিয়ার চলে যায় উচ্চশিক্ষার জন্য। সেখানে কয়েক বছর থেকে কাগজপত্র ছাড়াই ইংল্যান্ডে এসে মামার রেস্টুরেন্টে কাজে লেগে যায়। পড়ালেখা আর করে নাই। আমার তো এখন মনে হয় সে তখন আমার মতোই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সেইদিন তানিম আমার সাথে কিছু সময় কাটিয়ে আবার অক্সফোর্ডে ফিরে গিয়েছিল কিছু না খেয়ে। তানিম নিজে সিলেটি, তাই হয়তো বুঝেছিল আমাকে আবার কথা শুনতে হবে সে রেস্টুরেন্টে কিছু খেলে।

কথা বলাতে ব্যস্ত থাকায় ওরা খেয়াল করেনি কখন যেন সূর্যিমামা টুপ করে পানিতে হারিয়ে গেছে। চারিদিকে নিয়ন লাইট গুলো একে একে স্বয়ংক্রিয় ভাবে জ্বলে উঠছে। ওদের আশে পাশের পুরনো লোকগুলো চলে গিয়ে নতুন লোক চলে এসেছে। কেউ কেউ আবার অফিস ফেরত। গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডের সাথে বসে উবার, ডেলিভারো ইত্যাদির মাধ্যমে টেকওয়ে অর্ডার করে রাতের ডিনার খোলা আকাশের নিচে করে নিচ্ছে।

চলো উঠি। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। ইমদাদ তাড়া দেয় নিতুকে।

না। আরেকটু বসি। তোমার কথাগুলো শেষ করো। অনেকক্ষণ ধরে তন্ময় হয়ে শুনছিলাম নিতু।

আবার শুরু করে ইমদাদ। ব্রমলি সাউথের রেস্টুরেন্টে সর্বমোট দুই মাস কাজ করি। কলেজ থেকে ওয়ার্নিং লেটার আসছিল যে কলেজে ফেরত না আসলে তারা হোম অফিসকে ইনফর্ম করবে।

আবার কিছু দিন কলেজে ক্লাস করে বন্ধু আলমগীরের সহযোগিতায় ওয়েস্ট লন্ডনের বাটারসি পার্ক রোডের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ নিই। এখান থেকে কলেজের দূরত্ব কিছুটা কম। কলেজ ছিল লন্ডন ব্রিজ এলাকায়। এক বাসেই যাওয়া আসা করা যেত।

সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস ছিল। রেস্টুরেন্টের কাজ থেকে একদিন অফ পেতাম। শুধুমাত্র অফ দিনেই ক্লাস করতাম কিন্তু বাকি দুই দিন ক্লাস না করায় পড়ালেখার চাপ বেশি পরে যাচ্ছিল এবং কলেজে নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় কলেজ থেকেও চাপ আসছিল।

রেস্টুরেন্টের গাভনার (লন্ডনের রেস্টুরেন্ট মালিককে গাভনার বলে) আমাকে ভালোবাসতো। তাকে অনুরোধ করে সপ্তাহে কলেজের তিন দিন অফ নিয়েছিলাম। তারপর থেকে আমার অফ দিনে নিয়মিত কলেজের ক্লাসে যোগ দিয়েছিলাম। বাকি দিন গুলো রেস্টুরেন্টে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছিলাম। অফ দিনে সকাল নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাস করে আবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত একটা পর্যন্ত কাজ করতে হতো।

পড়ার চাপ বেড়ে যাওয়ায় রেস্টুরেন্টের উপরে রুমে একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার ধার এনেছিলাম আলমগীরের বন্ধু মইনের কাছ থেকে। তখন কম্পিউটারে ওয়াইফাই বা ইন্টারনেটের কোনো কানেকশন ছিল না। বিশ-পঁচিশ মিনিট হাঁটা দূরত্বে ক্লাপহাম জংশনের পাবলিক লাইব্রেরিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য বুকিং দিয়ে রাখতাম। উইকএন্ডে অথবা কলেজের অফ ডেতে লাঞ্চ ব্রেকে লাইব্রেরি ব্যবহার করে অ্যাসাইনমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন ফ্লপিড্রাইভে সেভ করে রাখতাম।

আমি আগে থেকেই নিয়মিত নামাজ পড়তাম কিন্তু ক্লাস এবং কাজের চাপে নামাজ সময়মতো পড়তে পারতাম না। আবার এ কথাও সত্য যে, রেস্টুরেন্টে আমাকে অ্যালকোহল সার্ভ করতে হতো। প্রতিদিন কাজ শেষে গোসল করে সারাদিনের নামাজ এক সাথে পড়তাম।

তারপর ফ্লপিড্রাইভে সেভ করা রাখা ইনফরমেশনগুলো দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট সাজাতাম। রাত শেষের দিকে এক-দুই ঘণ্টা ঘুমিয়ে কলেজে চলে যেতাম। এভাবেই দিন পার করছিলাম। কলেজের এক সেমিস্টার ক্রেডিট স্কোর নিয়ে পাশ করলাম। বাবার কাছ থেকে নেয়া টিউশন ফি পরিশোধ করে দিলাম।

অনেক দিন থেকেই মনের মধ্যে অপরাধ বোধের জন্ম নিচ্ছিল। আমি নামাজ পড়ছি আবার অ্যালকোহল সার্ভ করছি। দুটি বিপরীত ধর্মী কাজ কীভাবে করছি? ঠিক করছি? নবিজির স্পষ্ট হাদিস, এলকোহলের সাথে জড়িত চৌদ্দ প্রকার লোক জাহান্নামে যাবে। যে এলকোহল খায়, যে বানায়, যে সার্ভ করে, যে পরিবহন করে ইত্যাদি। আমার ইনকাম কি তাহলে হালাল হচ্ছে?

হালাল না হলে এই হারাম পয়সা আবার দেশে পাঠাচ্ছি! আবার ভাবি আমার তো কোন উপায় নেই। অন্য কোথায় কাজ পাবো? এই কাজ ছেড়ে দিলে খাবো কি? থাকবো কোথায়? কলেজের টিউশন ফি কিভাবে দিব? উপায় নাই বলতে আমি কি বুঝাচ্ছি। আমি কি চেষ্টা করেছি? না খেয়ে মারা যাচ্ছি? নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে আবার নিজেই প্রতিনিয়ত হেরে যেতাম।

হঠাৎ করে কোথা থেকে আমার মনের মধ্যে শক্তি আসলো জানি না। আল্লাহর হেদায়েত প্রাপ্ত হলাম। আল্লাহর ওপর ভরসা করে ডিসিশন নিলাম এই হারামের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ আর করবো না। কাজ ছেড়ে দিব। কপালে যা আছে তাই হবে। শয়তান কানে কানে বলছিল ইমোশনাল না হতে।

কাজ ছেড়ে দিলে খাবো কী? লন্ডনেই বা থাকবো কীভাবে ইত্যাদি। শয়তানের কথা না শুনে আল্লাহর ওপর ভরসা করে রেস্টুরেন্টের কাজ ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দিলাম যেখানে দীর্ঘ চার মাস কাজ করেছি। আমার জীবন-মরণের মালিক যেখানে আল্লাহ। সেখানে কী রিজিকের ভার তাঁর ওপর দিয়ে ভরসা করতে পারব না?

অক্সফোর্ডের তানিম আমাকে অনেকদিন থেকেই ওর ওখানে কয়েক দিন বেড়িয়ে যেতে বলছিল। কাজ ছাড়ার দিনই তানিমের ওখানে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম কিন্তু ওকে আমার কাজ ছেড়ে দেবার কথা কিছুই বললাম না। খামোখা চিন্তা করবে।

গাভনার আমাকে কাজে থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছিল। বেতন বাড়িয়ে দিবে, অফ ডে বাড়িয়ে দিবে ইত্যাদি। সকল প্রলোভন দূরে রেখে আমি এক সকালে আবার সেই লাগেজ দুটি নিয়ে আল্লাহর নামে অনিশ্চিত পথে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই নটিংহিল গেটের বাংলাদেশ সেন্টারে ডেফোডিলের পরিচিত ছোটভাই সাজ্জাদের ওখানে লাগেজগুলো রেখে শুধুমাত্র হাতব্যাগ নিয়ে অক্সফোর্ডে রওনা দিলাম।

অক্সফোর্ডে বিনা চিন্তায় দুই দিন ঘুরলাম, খেলাম। আসার দিনের আগের রাতে সাজ্জাদ ফোনে বললো যে পরের দিন লিভারপুল স্ট্রিটে ফাস্ট ফুড শপ আপারক্রাস্টে ইন্টারভিউ আছে। যদি সকাল সকাল আসতে পারি তাহলে সে আমার নাম দিবে ইন্টারভিউয়ের জন্য। আমি রাজি হয়ে গেলাম। খুশিতে মনটা ভরে ওঠল। আল্লাহ সাজ্জাদের মাধ্যমে আমার জন্য কাজের ব্যবস্হা করে দিয়েছেন। কেন যেন মনে হচ্ছিল আমার কাজ হয়ে যাবে।

পরের দিন আপারক্রাস্টে ইন্টারভিউ দিয়ে আমি, সাজ্জাদ এবং ড্যাফোডিলের আরেক ছোটভাই তারেকসহ বেরিয়ে পড়লাম থাকার জায়গা খুঁজতে।

লিভারপুল স্ট্রিট থেকে হেঁটে হেঁটে ব্রিকলেন, হোয়াইটচেপেল হয়ে স্টেপনিগ্রিন পর্যন্ত চলে আসলাম প্রতিটি দোকান, মসজিদে সাবলেট খুঁজতে খুঁজতে; কিন্তু পেলাম না। বাংলাদেশের মতো এখানে দেয়ালে, গাছে টু-লেট কিংবা সাব-লেটের নোটিশ লাগানো যায় না। রাত হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু মাথা গুজবার জায়গা পাচ্ছিলাম না। স্টেপনিগ্রিন মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে সাজ্জাদ মসজিদের সামনে ওসেন এস্টেটের একটি ফ্লাটে রুম ভাড়া নিয়ে নিল। একটি ছোট রুম। আমার জন্য একটু এক্সপেন্সিভ।

তবুও নিয়ে নিলাম, কিন্তু খাব কী? সাজ্জাদ তাড়াতাড়ি পাশের রহিম ব্রাদার্স নামক গ্রোসারি শপ থেকে দুটি পাতিল, চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মুরগি, মসল্লা ইত্যাদি বাজার করে রান্না করে দিয়ে গেল। বলে গেল দুই দিন পরে আবার এসে রান্না করে দিয়ে যাবে। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। শান্তির ঘুম দিলাম। আল্লাহ আমার রুজি-রুটির মালিক। আমার আবার ভয় কী?

পরের দিন সানডে। ব্রিকলেনের সানডে মার্কেট থেকে একটি পুরনো সাইকেল কিনে কলেজ যাওয়া শুরু করলাম। এক সপ্তাহের মাথায় আপারক্রাস্টে কাজে যোগদান করার সুখবর পেলাম। আলহামদুলিল্লাহ। আরো এক সপ্তাহের মাথায় আমরা সাতজন পরিচিতরা মিলে শেডওয়েলে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিলাম। নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

দেখো, আজ পড়ালেখার পাশাপাশি বিয়ে করে আমরা তিন কন্যার পিতামাতা। তুমিও আমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কষ্ট করে এ পর্যন্ত এসেছো। আল্লাহর ওপর ভরসা করে হারাম কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম বলেই হয়তো আল্লাহ আজ আমাদের লন্ডনে স্হায়ী করেছেন, ভালো কাজের সংস্হান করে দিয়েছেন। ইমদাদ তার দীর্ঘ আলাপের ইতি টানে।

নিতু এতক্ষণ তন্ময় হয়ে ইমদাদের কথা শুনছিল। চোখ ছল ছল। ইমদাদের এই বাস্তব ঘটনা আরও কয়েকবার ওর মুখে শুনেছে। আল্লাহর প্রতি ওর অবিচল বিশ্বাস ওকে আরো ইমদাদের প্রতি সন্মান ও ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়। কষ্ট করে হলেও ওরা হালাল-হারাম বেছে চলছে। আল্লাহর রহমতে মেয়েরাও বাবা-মাকে অনুসরণ করছে। এসব মনে মনে ভাবলেও নিতু ইমদাদকে বলে, চলো চলো এক কথা কয়বার বলবে? একবার শুরু করলে আর থামার নাম নেই।

গল্পের ঘোরে বুঝতেই ওরা পারেনি যে মামাদের ডিউটি পরিবর্তন হয়ে গেছে। সূর্যিমামার জায়গায় কখন চাঁদ মামা চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি। অনেক দিন পর ওরা দুজন একান্তে কিছু সময় কাটানোয় ভালোই লাগছে। রাত হয়ে যাওয়াতে ওরাও ঘরের দিকে রওনা দেয়। সামনেই টাওয়ার গেটওয়ে ডিএলআর স্টেশন। ওখান থেকে ট্রেন নিয়ে পপলার স্টেশনে চেঞ্জ করে দুটো স্টপেজ পরেই ওদের গন্তব্যস্থল।

কষ্ট আসবে, বাধা আসবে। বাবা-মা ভুল বুঝবে। বন্ধু-বান্ধব দূরে চলে যাবে। কারণ এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তার ঈমানদার বান্দাদের পরীক্ষা করেন। আল্লাহর ওপর ভরসা করে যে চেষ্টা করে যায়, সে কখনো হেরে যায় না। দুনিয়ার মানুষের কাছে সে পরাজিত হলেও আল্লাহর কাছে সে জয়ী। বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আল্লাহু আকবার।

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
ইমদাদ ইসলাম, লন্ডন
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো সংবাদ