#  সাকিবের দুর্দান্ত ব্যাটে জয় টাইগারদের #  লাখাইয়ে ৭০ টি মন্ডবে পূজার প্রস্তুতি #  ডাঃ মুখলিছুর রহমানকে ‘বাইয়াফি’ সংগঠনের ফুলেল শুভেচ্ছা #  হবিগঞ্জে বঙ্গবন্ধু ফুটবল টুর্নামেন্টে সেমিফাইনালে বাহুবল #  হবিগঞ্জে ৫ দিনে আড়াই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ #  মাধবপুরে ১১ বস্তা সরকারী চাল জব্দ #  কার্তিকের সঙ্গী কিয়ারা #  যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যবহারে গ্যাসের ভূমিকা শীর্ষক কনফারেন্সে এমপি আবু জাহির #  চুনারুঘাটে মাদক বিরোধী সভা #  শ্রীলঙ্কাকে উড়িয়ে বাংলাদেশ যুবাদের জয় #  শ্রীমঙ্গলে ফুটবল টুর্নামেন্টে কালেঞ্জি পুঞ্জি চ্যাম্পিয়ন #  হবিগঞ্জে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস উদযাপন #  সিলেটে নিখোঁজ মাদরাসা ছাত্রের লাশ উদ্ধার #  বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করল মালদ্বীপ #  মাধবপুরে মাদক বিরোধী সভা: চা শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ

করাঙ্গীনিউজ: দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮০ লাখ। সরকারি হিসাবে এদের মধ্যে প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষ সাক্ষর। বাকি ২৬ শতাংশ বা ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৮০ হাজার মানুষ এখনও নিরক্ষর।

যদিও বেসরকারি হিসাবে সাক্ষরতার হার ৬৫ শতাংশের বেশি নয়। সেই হিসাবে নিরক্ষর মানুষ ৫ কোটি ৮৮ লাখের বেশি। এসব মানুষকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করার মতো কার্যকর কোনো কর্মসূচি নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে তিন লক্ষাধিক মানুষকে বয়স্ক শিক্ষার আওতায় আনতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী ছিলেন জেলা প্রশাসকরা। ওই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন দাতারা। এরপর ৬টি প্রকল্প নেয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে; কিন্তু তার কোনোটিই প্রকৃত অর্থে নিরক্ষরতা দূর করার প্রকল্প ছিল না। প্রকল্প গ্রহণে ত্রুটি, দুর্বল পরিকল্পনা, উপযুক্ত বাস্তবায়নকারী সংস্থা নির্বাচন না করা এবং বাস্তবায়নকারীর সক্ষমতার অভাবে নিরক্ষরতা তেমন একটা দূর হয়নি। ফলে যেসব মানুষকে সাক্ষরতার আলো দেয়া দরকার, তারা তা পাননি।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, প্রকৃত নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করতে যে ধরনের কার্যক্রম নেয়া দরকার, গত দুই দশকে তা নেয়া হয়নি। দাতারা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পর সরকার বিভিন্ন সময়ে নিরক্ষরতা দূর করার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা ছিল স্বল্পমেয়াদি ও প্রকল্পভিত্তিক। এতে নিরক্ষরতা সেই অর্থে দূর হয়নি। এই সময়ে সাক্ষরতা হার বেড়ে বর্তমানে যেখানে দাঁড়িয়েছে, তাতে নিরক্ষরতা দূর করার কর্মসূচির কোনো অবদান নেই। গোটা অবদানই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার।

সরকারি হিসাবে বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রতিবছর গড়ে ১ শতাংশ করে কমছে নিরক্ষর মানুষের হার। তবে রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, জাতিসংঘ নির্ধারিত সংজ্ঞা সামনে রেখে তিন বছর আগে আমরা সাক্ষরতার হার নিরূপণ করি। তখন পাওয়া যায় ৫১

দশমিক ৩ শতাংশ। শিক্ষার প্রতি মানুষের ঝোঁক এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় সরকারের জোরদার কর্মসূচি বিবেচনায় সাক্ষরতার হার বর্তমানে কিছুতেই ৬৫ শতাংশের বেশি হবে না। তিনি বলেন, আর যদি সরকারের ঘোষিত সাক্ষরতার হারও মেনে নিই, তবুও নিরক্ষরতার সংখ্যা অনেক। ২৬ শতাংশ নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষর করার কার্যকর কর্মসূচি কোথায়? বছর ঘুরে আজ আবার এসেছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে আজ রাজধানীসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচি পালিত হবে। মূল কর্মসূচি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য- ‘বহু ভাষায় দক্ষতা, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা’।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী বলেন, ইউনেস্কো এবার বহু ভাষায় দক্ষতার মাধ্যমে সাক্ষরতা দিয়ে জীবনমানের যে উন্নতির কথা বলেছে, বাংলাদেশ তা ৩ বছর আগেই শুরু করেছে। ২০১৬ সালে আমরা প্রথমে প্রাক-প্রাথমিকে ৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের হাতে মাতৃভাষায় বই তুলে দিই। এগুলো হচ্ছে- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রী। এবার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ওই বই পেয়েছে। ফলে বাংলার পাশাপাশি অন্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার কার্যক্রম চলছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নকালে নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত সময়ের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তখন দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

নির্বাচনী ইশতেহারের লক্ষ্যপূরণে সরকার এরপর একটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। সেটি অনুযায়ী ছাত্রলীগের কর্মীদের মাধ্যমে সাক্ষরতা কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দেয়া হয়। পাশাপাশি সরকার তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা করে, যেটির কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালের জানুয়ারিতে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন দিয়ে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হয়। দাতা সংস্থাও এতে সহায়তা করেনি। ফলে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এরপর সরকারই উল্টো দাতাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজস্ব অর্থে ৪৫ লাখ নিরক্ষরকে মৌলিক সাক্ষরতা ও জীবনদক্ষতা প্রদানে ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। এজন্য ২০১৭ সালে ৬৪ জেলায়ই কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম ধাপে ১৩৭ উপজেলায় এনজিও নিয়োগের মাধ্যমে ‘মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প’র কাজ শুরু করে। কিন্তু সাক্ষরতার অন্যান্য প্রকল্পের মতো এটিও শুরুতেই বিতর্কের মুখে পড়ে। ভুঁইফোঁড়, নাম-ঠিকানাবিহীন ও জাল-জালিয়াতির দায়ে চিহ্নিত কিছু এনজিওকে নিরক্ষরতা দূরের কাজ দেয়া হয়। এক বছরের বেশি ফাইল আটকে রাখেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব। এরপর ২০১৭ সালের ১১ জুন নির্বাচিত ২৫০টি এনজিও’র নাম প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠে।

এ নিয়ে আদালতে মামলা, সমাজসেবা অফিসে অভিযোগ দায়েরের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু এরপরও রহস্যজনক কারণে মন্ত্রণালয় ওইসব এনজিও নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যায়। দ্বিতীয় ধাপে আরও কিছু উপজেলায় নিরক্ষরতা দূর করার কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এজন্য কিছু এনজিওর কাছ থেকে আবেদন নেয়া হয়েছে। ওইসব আবেদন যাচাই-বাছাই চলছে। ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু দেরিতে কার্যক্রম শুরুর কারণে এখন এটি ২০২০ সালের জুনে শেষ করবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক কেএম এনামুল হক বলেন, এমনিতেই নিরক্ষরতা দূর করার কার্যক্রম নেই ২০ বছর ধরে। এরপরও স্বল্পমাত্রায় যে কর্মসূচি নেয়া হয়েছে তাতে যদি উপযুক্ত বাস্তবায়নকারী নির্বাচন সম্ভব না হয়, তাহলে অর্থ ব্যয়টাই হবে অনর্থক।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন বলেন, এনজিও নিয়োগ নিয়ে আগে কী হয়েছে, সেটা আমার জানা নেই। তবে আমরা এখন যোগ্যতার ভিত্তিতেই এনজিও নির্বাচন করব। তাদের কাজ কঠোরভাবে মনিটর করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু চলমান প্রকল্পই নয়, নিরক্ষরতা দূরের নামে ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নেয়া ৭টি প্রকল্পের ব্যাপারেই আছে নানা অভিযোগ। বাংলাদেশে বয়স্ক শিক্ষায় নেয়া কোনো প্রকল্পে সফলতার ইতিহাস নেই। বেশির ভাগ প্রকল্পে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আছে। তিন লক্ষাধিক মানুষকে বয়স্ক শিক্ষার আওতায় আনতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা নেয় সরকার। তবে দাতা সংস্থার অভাবে পরবর্তী সময়ে সেটিও মুখ থুবড়ে পড়ে।

জানা গেছে, মানব উন্নয়নের জন্য সাক্ষরতা-উত্তর ও অব্যাহত শিক্ষা প্রকল্প-২ নামে যে প্রকল্প নেয়া হয় তাতে শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্ক নেই- এমন ভুঁইফোঁড় স্থানীয় কিছু এনজিওর মাধ্যমে কাজ করানো হয়েছে। বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইইডি) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। এ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অন্যতম সমস্যা ছিল, জেলাভিত্তিক ২৯টি এনজিও নির্বাচনে অনভিজ্ঞরা প্রাধান্য পায়। ফলে অনেক জেলায় প্রকল্প কার্যক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকল্পের উদ্দেশ্য অর্জনে অনেক এনজিও ব্যর্থ হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের বেইসলাইন জরিপ এনজিও দিয়ে করানোর ফলে শুধু অর্থের অপচয় হয়েছে। আইএমইডির ওই প্রতিবেদন তৈরি করতে ব্যক্তিপরামর্শক হিসেবে কাজ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. এএসএম আমানউল্লাহ। সম্প্রতি তিনি যুগান্তরকে জানান, প্রতিবেদন প্রস্তুতকালে কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টোটাল লিটারেসি মুভমেন্ট (টিএলএম) প্রকল্পের আদলে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা নিয়েছিল সরকার। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সবচেয়ে বড় সাক্ষরতার প্রকল্প ছিল সেটি। কিন্তু ২০০৩ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার অনিয়মের অভিযোগে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। এমনকি তখন এ সংক্রান্ত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ভেঙে দেয়া হয় এবং ২০০৫ সালে সেটি বিএনএফইতে রূপান্তরিত করা হয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে নিরক্ষরতা দূর করার লক্ষ্যে পরে বিএনএফই কোনো বড় কর্মসূচি নেয়নি।

উল্লেখ্য, দেশে ১৯৭১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ ভাগ। ১৯৯১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৩ এবং ২০০১ সালে ৪৭ দশমিক ৯। ২০০৮ সালে ৪৮ দশমিক ৮ ভাগ আর ২০০৯ সালের হিসাবে ৫৩ ভাগ। এটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য।