1. nafiz.hridoy285@gmail.com : Hridoy Fx : Hridoy Fx
  2. miahraju135@gmail.com : MD Raju : MD Raju
  3. koranginews24@gmail.com : সম্পাদক : সম্পাদক
আছগর আলী স্যার : শেষ জীবনে যার জরাজীর্ণ বাড়িতে বসবাস - করাঙ্গীনিউজ
করাঙ্গী নিউজ
স্বাগতম করাঙ্গী নিউজ নিউজপোর্টালে। ১৩ বছর ধরে সফলতার সাথে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে আসছে করাঙ্গী নিউজ। দেশ বিদেশের সব খবর পেতে সাথে থাকুন আমাদের। বিজ্ঞাপন দেয়ার জন‌্য যোগাযোগ করুন ০১৮৫৫৫০৭২৩৪ নাম্বারে।

আছগর আলী স্যার : শেষ জীবনে যার জরাজীর্ণ বাড়িতে বসবাস

  • সংবাদ প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৮ মে, ২০২২

ফয়সল আহমদ রুহেল :
মো. আছগর আলী স্যার। তিনি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জের জে.কে উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। লাখাইয়ের এক অজোপাড়া গাঁওয়ে কেটেছে স্কুল জীবন। বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল না ভালো। শৈশবে মানুষের বাড়িতে থেকেছেন লজিং। দীর্ঘ পথ খালি পায়ে হেঁটে স্কুলে আসা-যাওয়া করেছেন। তারপরও নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। জার্মান, ইতালীসহ বেশ ক’টি দেশও করেছেন ভ্রমন। নিজের সর্বস্ব এবং সর্বোচ্চটা দিয়ে তৈরী করেন হাজারো কীর্তিমান। জীবনের ত্রিশ বছর শিক্ষকতায় পার করা মহান এই মানুষটিকে শেষ জীবনে জরাজীর্ণ বাড়িতে বসবাস।

জন্ম : শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আছগর আলী ১৯৪৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মশাদিয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর বাবা মরহুম আফতাব উদ্দিন ও মাতা নুরুন্নাহার। ২ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৩য়।

শিক্ষা জীবন : আদর্শবান শিক্ষক মো. আছগর আলী ১৯৫১ সালে ৫ বছর বয়সে মশাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে সফলতার সাথে ৫ম শ্রেণীতে উর্ত্তীণ হন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের রাঢ়িশাল-করাব উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। ভর্তি হওয়ার পরই তিনি সিংহগ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে লজিং থাকেন। ওই স্কুলে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন তিনি। পরে ৮ম শ্রেণীতে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ভর্তির পরই তিনি তার এক চাচার বন্ধুর বাড়িতে লজিংয়ে উঠেন। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে এসএসসি পাশ করেন তিনি। এসএসসি পাশ করার পর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন নিয়ে টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত কলেজে ভর্তি হন। ওই কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। পরবর্তীতে একই কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে বিএসসি পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণী বিদ্যায় এমএসসি পাশ করেন।

কর্মজীবন : শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মো. আছগর আলী স্যার শিক্ষা জীবন শেষ করে ১৯৬৯ সালের দিকে শিক্ষকতা পেশায় জড়িয়ে যান। প্রথমে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ওই প্রতিষ্ঠানে তিনি ৯ বছর সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন। সেখানে শিক্ষকতা কালীন সময়ে ফরিদপুরের এক চাকুরীজীবি মহিলা সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে আছগর আলীর। পরে ওই মহিলার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। এরপর আছগর আলী শিক্ষকতা বাদ দিয়ে জার্মান চলে যান। সেখানে ৬ বছর বসবাস করেন। পরে জার্মান থেকে ইতালীসহ আরো কয়েকটি দেশ ভ্রমণ শেষে ১ বছরে পর দেশে চলে আসেন। দেশে আসার পর স্ত্রীর সাথে মনোমানিলতা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে স্ত্রী সাথে তাঁর সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়। এ অবস্থায় অনেকটা হতাশ হয়ে নিজ গ্রামে চলে আসেন এবং আত্মীয় স্বজনের পরামর্শে দ্বিতীয় বিবাহ করেন তিনি। বিয়ের পর এলাকার মানুষের অনুরোধে ১৯৯০ সালের ১৪ জুলাই কালাউক উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হিসেবে আবারও শিক্ষকতা শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি ওই স্কুলটির শিক্ষার মান্নোয়নে অন্যান্য স্কুলের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালে লাখাই উপজেলার শ্রেষ্ট শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন তিনি। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁর হাতে সম্মাননার নগদ অর্থসহ সার্টিফিকেট তুলে দেন। পরবর্তীতে তিনি ২০০১ সালের ৭ জানুয়ারি নবীগঞ্জ জে.কে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে ৫ বছর সুনামের সাথে শিক্ষকতা করার পর বিধি অনুযায়ী অবসর গ্রহন করেন তিনি। ২০০৬ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নবীগঞ্জে জে কে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামে আসার পর আদর্শ এই শিক্ষক গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। তিনি এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সচেতন করেন যাতে তাদের ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া করাতে উৎসাহিত হন। প্রায় ৩০ বছর সত্যতা ও নিষ্টার সাথে দায়িত্ব পালন করেন এই গুণী শিক্ষক আছগর আলী। কর্মজীবনে তিনি ইংরেজি, রসায়নসহ বিভিন্ন সাবজেক্ট পড়িয়েছেন।

শৈশব : মো. আছগর আলী এর বাবার ছিলেন তখনকার সময়ের একজন বাঁশ ব্যবসায়ী। তার দাদা মফিজ উদ্দিন ছিলেন একজন কৃষক। জন্মের পর দাদা দেখেননি তিনি। তবে তার দাদী তাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি যখন ২/৩ বছরের ছিলেন তখন তার দাদিও মারা যান। বাবা’র ব্যবসা ও কৃষি জমির আয়ের উৎস দিয়ে মোটামুটি ভাবে তাদের পরিবার চলতো। তার বাবা খুবই স্নেহ পরায়ন ও সাদামাটা লোক ছিলেন। তিনি সব সময় বলতেন আমার ছেলে আছগর মেধাবী ও সৎ মানুষ হবে। একটা সময় আছগর আলীর বাবার ছোট ব্যবসা, কৃষি নির্ভর অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন একটা ভালো ছিলো না। এ অবস্থায় তার বড় ভাই ভারতে চলে যান। সেখানে গিয়ে চাকুরী করেন তখনই তাদের সংসারে আয়ের উৎস বেড়েছে।
আছগর আলীর বয়স যখন ৪ বছর তখন তাঁর বাবা বাড়ির পাশের মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের জন্য ভর্তি করে দেন। সেখান থেকে কোরআন শিক্ষা লাভ করেন তিনি। পরবর্তীতে তাকে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করা হয়।

বিদ্যালয়ের জন্য যত কিছু : তখনকার সময় নবীগঞ্জ জে.কে উচ্চ বিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার থেকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল ও গুণগত মান বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন বিদ্যালয়ের একটি ভবন নির্মানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয়।

শিক্ষকের ছাত্ররা : আছগর আলী স্যারের বৃহত্তর সাফল্য হলো প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। এতের মধ্যে স্যারের অনেক শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে অবদান রেখেছে।
এই শিক্ষকের অনেক ছাত্ররা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।

 

এই শিক্ষকের সহপাঠী :
আছগর আলী স্যারের অধ্যায়নকালীন সময়ে সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন গোপাল কৃষ্ণ নাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রাক্তন শিক্ষক), ড. আব্দুল খালেক ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক। এছাড়াও তার বিভিন্ন সহকর্মীরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

পারিবারিক : শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মো. আছগর আলী স্যার ব্যক্তিগত জীবনে দুটি বিবাহ করেন। প্রথম স্ত্রীর ২ পুত্র সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে বড় ছেলে তালুকদার সাব্বির আছগর বাংলাদেশ লেখাপড়া শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করে সেখানে বসবাস করছেন। ২য় ছেলে তন্ময় শাহরিয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেজুয়েশন সম্পন্ন করে ঢাকাতে বসবাস করছেন। ২য় স্ত্রীর ১ম ছেলে এএম তামিম মাদ্রাসায় ফাজিল এ অধ্যায়নরত অবস্থায় মসজিদে ইমামতি করছেন। ছোট ছেলে শামীম শাহরিয়ার হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন কলেজে বিএ অধ্যায়নরত।

শিক্ষকতায় যেভাবে আসা : হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মহিউদ্দিন স্যার মো. আছগর আলীর সম্পর্কে খালাত ভাই। যখন মো. আছগর আলী লেখাপড়া শেষ করেন, তখন মহিউদ্দিন স্যার সহ অন্যান্য আত্মীয় স্বজন তাঁকে শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তখন সবদিক হিসেবে করে দেখে শিক্ষকতাই বেছে নিলেন। তাঁর কাছ থেকে ছাত্ররা শিক্ষা গ্রহন করে দেশ-বিদেশে কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখছে। আবারও অনেকেই দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করছে।

গুনী এই শিক্ষক ২০২২ সালে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে কাজ করা হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার কৃতি সন্তান জনাব টি, আলী স্যারের নামে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাজ্য ভিত্তিক চ্যারেটি সংস্থা টি,আলী স্যার ফাউন্ডেশনের জরিপে লাখাই উপজেলার আদর্শ শিক্ষকের সম্মাননার স্বীকৃতি হিসেবে টি, আলী স্যার ফাউন্ডেশন সম্মাননা পদকে ভুষিত হয়েছেন।
উল্লেখ্য, ফাউন্ডেশন হবিগঞ্জ জেলার নয় উপজেলার ১৮ জন আদর্শ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে পদক দেয়ার পাশাপাশি তাদের জীবনী ধারাবাহিকভাবে লিখছেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি টি, আলী স্যারের পুত্র বৃটেনের জনপ্রিয় চ্যানেল এস টেলিভিশনের সাংবাদিক ফয়সল আহমদ ( রুহেল )। পদকপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে থেকে আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ৫ জন শিক্ষককে আর্থিক সহযোগিতাও দেবে সংস্থাটি।

মো. আছগর আলী তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা, জ্ঞানভান্ডার নিজের মধ্যে লুকিয়ে না রেখে ছড়িয়ে দিয়েছেন হাজারো শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তবে এই শিক্ষক নিজে তেমন কোন অর্থ সম্পত্তি উপার্জন করেননি। শেষ জীবনে তিনি জরাজীর্ণ বাড়িতে বসবাস করছেন। উচ্চ শিক্ষিত দুই সন্তানরাও তার কোন খোঁজ খবর রাখছেন না। এ অবস্থায় ২য় স্ত্রীর সন্তানদের নিয়ে অনেকটা কষ্টের মধ্যে শেষ জীবন অতিক্রম করছেন বহু গুণে গুণান্বিত এই আদর্শ শিক্ষকে মো. আছগর আলী। আমরা তাঁর দীর্ঘায়ূ কামনা করি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো সংবাদ
x